আবারো দ্রুত ধনীদের শীর্ষ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২০২০-০৫-২২ ১৪:১৯:৩৯

জিডিপির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জনেরপাশাপাশি দেশে ধনী-দরিদ্রের মধ্যকারআয়বৈষম্যও বাড়ছে। এর ফলে শুধু ধনীদেরসম্পদ বাড়ছে। আর এতে ধনীদের সম্পদবৃদ্ধির বিবেচনায় শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায়আবারো উঠে এসেছে বাংলাদেশ। চলতিমাসে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্পদ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওয়েলথএক্স প্রকাশিত একপ্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।সংস্থাটির বছর দুয়েক আগের প্রকাশিতপ্রতিবেদনেও বাংলাদেশের ধনীদের দ্রুতসম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছিল।

‘এ ডিকেড অব ওয়েলথ, এ রিভিউ অব দ্যপাস্ট টেন ইয়ার্স ইন ওয়েলথ অ্যান্ড এ লুকফরোয়ার্ডস টু দ্য ডিকেড টু কাম’ শীর্ষকপ্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়েদ্রুতগতিতে সম্পদ বাড়ছে এমনবাজারগুলো এশিয়ার। যেখানে রয়েছে ছোট-মাঝারি অর্থনীতির মিশ্রণ। সম্পদ দ্রুতবাড়ছে এমন শীর্ষ দশ দেশের মধ্যেএশিয়ার ছয়টি। আঞ্চলিক সরবরাহ চেইননিবিড়তা ও বাড়তে থাকা তরুণ কর্মশক্তিরসহায়তা নিয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিকপ্রবৃদ্ধির ধারায় র্যাংকিংয়ের শীর্ষে রয়েছেভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গত এক দশক শুধুচীনেরই অব্যাহত সম্প্রসারণ নয়, বরং এরমধ্যে রয়েছে অঞ্চলটির অন্যান্য অর্থনীতিরওউন্নয়ন। অর্থনীতিগুলো দ্রুত নগরায়ণসহ কমউৎপাদনশীল কৃষি থেকে শিল্প ও সেবাখাতের দিকে যাচ্ছে।  বাংলাদেশ ওভিয়েতনাম দুই দেশেই ২০১০ সালেতুলনামূলক কম সম্পদশালী ব্যক্তি ছিল।যার আংশিক প্রতিফলন হলো দেশগুলোরসম্পদশালী জনগোষ্ঠীর শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি।বিশ্বের সব দেশের তুলনায় বহিরাগত সম্পদসত্ত্বেও সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি হওয়া শীর্ষ দশদেশের মধ্যে রয়েছে পরিপক্ব যুক্তরাষ্ট্র।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১০ থেকে ২০১৯পর্যন্ত দ্রুত সম্পদশালী হওয়াবাজারগুলোতে ৫০ লাখ ডলারেরও বেশিসম্পদ এমন জনগোষ্ঠীর বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধিবাংলাদেশের ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ।ভিয়েতনামে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ।তালিকার তৃতীয় অবস্থানে চীনের প্রবৃদ্ধি ১৩দশমিক ৫ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকাকেনিয়ার ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। পঞ্চমঅবস্থানে ফিলিপাইনসের ক্ষেত্রেসম্পদশালীদের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ১১দশমিক ৯ শতাংশ।

থাইল্যান্ডে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬শতাংশ, দেশটির অবস্থান ষষ্ঠ। সপ্তমঅবস্থানে থাকা নিউজিল্যান্ডে বার্ষিক গড় ৮দশমিক ৭ শতাংশ। পরিপক্ব বাজার যুক্তরাষ্ট্ররয়েছে অষ্টম অবস্থানে, দেশটিতে ৫০ লাখডলারেরও বেশি সম্পদশালীদের বার্ষিক গড়প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এদিকে নবমঅবস্থানের পাকিস্তানে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ৭দশমিক ৫ শতাংশ। দশম অবস্থানে রয়েছেআয়ারল্যান্ড, দেশটির সম্পদশালীরাবার্ষিক ৭ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়ছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, আমাদেরসহগোটা এশিয়ায়ই একদিক থেকে বিষয়টিগর্বের। আরেক দিক থেকে বিষয়টি উদ্বেগের।এরই মধ্যে যুক্ত হয়ে না থাকলেও গর্বএজন্য যে আমাদের কিছু মানুষবিলিয়নেয়ার লীগে যুক্ত হবেন। খুব দূরভবিষ্যৎ নয় যে চীন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছে।ভারতও অনুসরণ করবে। আর আমরাও ছোটআকারে অনুসরণ করব। বিষয়টির ইতিবাচকএ দিকটি গর্বের। অন্য দিক হলো আয়বণ্টন, যা প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। গত এক দশকেআয়বণ্টন ছিল খুবই খারাপ, যা সরকারেরজন্য চ্যালেঞ্জের। এ সমস্যাটি সবসময়ইছিল।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ওয়েলথঅ্যাকুমুলেশন র্যাপিডলি হচ্ছে। যেটা হচ্ছেসেখানে একশ্রেণীর লোক রাজনৈতিকসুবিধা ভোগ করে এটাকে অনেক বড় করেফেলছে। সমাজের খেলায় কোনো ন্যায্যতানেই। সরকারের করনীতিরও ব্যর্থতা এটা।করনীতিতে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে যারারাজস্ব দিচ্ছে তাদের মধ্যে ধনী ব্যক্তিদেরনাম নেই। বাংলাদেশের বিলিয়নেয়াররাসর্বোচ্চ করদাতা নয়। সমাজের সমতানিশ্চিত করার ধারায় আসতে অন্যতমউপকরণ হলো করনীতি। উন্নত দেশগুলোয়এটাই করা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে কিছুহচ্ছে না।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহীপরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বণিকবার্তাকে বলেন, গত ১০ বছরে যেটা হয়েছে২০০০ সালের দিকে আমাদের নিচে থাকাশীর্ষ ৫ শতাংশের অংশ ১ শতাংশের ওপরেছিল। সেটা ২০১০-এ নেমে দশমিক ৯শতাংশের মতো এসেছে। ইদানীং সেটাআরো কমে শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্যদশমিক ৩-এ চলে গেছে। এটা গুরুতরউদ্বেগ। এখন প্রকৃত অর্থেই চিত্রটি খারাপ।কারণ তাদের অংশটা এক-চতুর্থাংশ হয়েগেছে। এক দশক আগে ১ শতাংশের কমথাকলেও এখন তারও চার ভাগের এক ভাগহয়ে গেছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

দেশে গত কয়েক বছরে জিডিপিরউল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছেধারাবাহিকভাবেই। একই সঙ্গে ধনী-দরিদ্রেরমধ্যে আয়ের বৈষম্যও বেড়েছে। আর এরফলে সম্পদ বেড়েছে শুধু ধনীদেরই। গতপাঁচ বছরে ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির বিবেচনায়শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।

‘ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮’শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশেধনকুবেরদের সামগ্রিক সম্পদের বার্ষিকপ্রবৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ধনীদেরসম্পদের প্রবৃদ্ধির এ হারের সুবাদেওয়েলএক্সের তৈরি তালিকায়ও শীর্ষ দশেরপ্রথম স্থানটি বাংলাদেশের দখলেই ছিল।তবে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্পদশালীধনীদের সিংহভাগই চীনের। সম্পদেরবিবেচনায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধিঅর্জনকারী ৩০ শহরের মধ্যে চীনেরইরয়েছে ২৬টি। পাশাপাশি ভারত ওহংকংয়েও রয়েছে এমন সম্পদশালীদেরউপস্থিতি। এর বাইরে যেসব দেশ রয়েছেতার মধ্যে উল্লেখযোগ হলো ভিয়েতনাম ওইন্দোনেশিয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈষম্যের যে প্রবণতারকথা আমরা বলছি, যেখানে বৈষম্যপ্রচণ্ডভাবে বাড়ছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির সুফলএকটা ক্ষুদ্র ধনাঢ্য গোষ্ঠীর কাছে গিয়েজমছে। গবেষণায় তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

এ চিত্র উদ্বেগের কারণ উল্লেখ করেবেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফরপলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয়ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বণিকবার্তাকে বলেন, দারিদ্র্য কমা সত্ত্বেও আয়েরবৈষম্য বাড়ছে, কেন্দ্রীকরণ বাড়ছে, সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। ভোগের যে বৈষম্যতার থেকে বেশি আয়ের বৈষম্য। আর এরচেয়েও বেশি সম্পদের বৈষম্য। সরকারিতথ্য-উপাত্তেই এ প্রবণতা দেখা যায়। এখনবৈশ্বিকভাবে যে চিত্র উঠে এসেছে তা অত্যন্তউদ্বেগজনক। রাজস্বনীতি, প্রাতিষ্ঠানিকসক্ষমতা, মুদ্রানীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগসৃষ্টির বিষয়ে আমাদের আরো নজর দেয়াউচিত বলে এ গবেষণার তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীদের তালিকায়স্থান করে নিয়েছেন সেখানে স্থায়ী বসবাসেরঅনুমতি পাওয়া বাংলাদেশী ব্যবসায়ীমুহাম্মদ আজিজ খান। প্রভাবশালী মার্কিনসাময়িকী ফোর্বস তাদের আগস্ট সংখ্যায়সিঙ্গাপুরের ৫০ শীর্ষ ধনীর যে তালিকাপ্রকাশ করেছে মুহাম্মদ আজিজ খানেরঅবস্থান সেখানে ৩৪তম। বাংলাদেশী সামিটগ্রুপের চেয়ারম্যানের মোট সম্পদেরপরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৯১ কোটিমার্কিন ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় সাড়েসাত হাজার কোটি টাকার বেশি।

সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর র্যাংকিংয়ের জন্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদেরশেয়ারহোল্ডিংয়ের পাশাপাশি পরিবার, স্টকএক্সচেঞ্জ, বিশ্লেষক ও অন্যান্য উৎস থেকেপাওয়া আর্থিক উপাত্ত ব্যবহার করেছেফোর্বস। পারিবারিক সম্পদও অন্তর্ভুক্ত করাহয়েছে তালিকায়।

গবেষণা প্রতিবেদন তৈরিতে দুটি ধাপে তথ্যবিশ্লেষণ করে ওয়েলথএক্স ইনস্টিটিউট।প্রথম ধাপে ইকোনমেট্রিক কৌশল ব্যবহারকরা হয়। এক্ষেত্রে পুুঁজিবাজারের আকার, জিডিপি, করহার, আয় ও সঞ্চয়ের তথ্যসংগ্রহ করে তারা। এজন্য তথ্যের উৎসহিসেবে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, ওইসিডি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোরপরিসংখ্যান সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষকে গুরুত্বদেয় প্রতিষ্ঠানটি।

আর দ্বিতীয় ধাপে জনপ্রতি সম্পদেরপরিমাণ হিসাব করা হয়। তবে বেশির ভাগক্ষেত্রে সম্পদের বণ্টনসংক্রান্ত তথ্যেরঘাটতি থাকায় সংশ্লিষ্ট দেশে মানুষেরআয়বণ্টনের হিসাব বিবেচনায় নেয়া হয়।এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কাছে থাকা বিশ্বব্যাপীঅত্যধিক সম্পদশালী ১ লাখ ৬০ হাজারেরবেশি তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করা হয়। এতেআর্থিক স্থিতি, কর্মজীবন, ঘনিষ্ঠ সহযোগী, পারিবারিক তথ্য, শিক্ষাজীবন, আগ্রহ ওশখসহ  সম্পদশালীদের ব্যক্তিগত বিভিন্নতথ্য রয়েছে। পাশাপাশি অর্জিত সম্পদেরবিনিয়োগ ও ব্যয়ের প্রবণতার তথ্যওবিবেচনায় নেয়া হয়। এসব তথ্য বিশ্লেষণকরে সম্পদের প্রকৃত ও গ্রহণযোগ্য চিত্রতুলে ধরা হয়।

ওয়েলথএক্সের নিজস্ব এ মডেলে নমিনালজিডিপি বিবেচনায় বিশ্বের প্রধানশহরগুলোর জনগোষ্ঠী, সম্পদ ওবিনিয়োগযোগ্য সম্পদের পরিমাণ হিসাবকরা হয়।

ট্যাগ :