এধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি উখিয়ায় একই পরিবারের নারী ও শিশু সহ ৪ জনকে জবাই করে খুন, সর্বত্র নিন্দার ঝড়

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-২৬ ২০:৩৫:৫১

(আপডেট)
রফিকুল ইসলামঃ
কক্সবাজারের উখিয়ায় একই পরিবারের ৪ জনকে একসাথে গলা কেটে জবাই করে খুন করা হয়েছে। যে বাড়িতে এ নারকীয় মর্মান্তিক খুনের ঘটনা ঘটেছে সেখানে কোন পুরুষ লোক ছিল না। বৃহস্পতিবার (২৬সেপ্টম্বর) দিবাগত রাতের কোন এক সময় এ খুনের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে স্হানীয় লোকজন ও প্রশাসনের ধারণা। ঘটনার আলামত সংগ্রহ শেষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে মৃতদেহ ৪ টি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়।

উখিয়ার রত্নাপালং ইউনিয়নের পূর্ব রত্না গ্রামের কাটির মাথা গ্রামে এ খুনের পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছে। স্হানীয় মৃত প্রবীণ বড়ুয়ার স্ত্রী সখি বড়ুয়া (৬০),পুত্রবধু মিলা বড়ুয়া (২৫),ছোট শিশু রবিন বড়ুয়া (৫) ও সনি বড়ুয়া (৬) কে দূর্বৃত্তরা নির্মম ভাবে জবাই করে হত্যা করেছে। সুখি বড়ুয়া তার কুয়েত প্রবাসী পুত্র রোকেন বড়ুয়ার স্ত্রী মিলা বড়ুয়া ও নাতি রোকনের ছেলে রবিন বড়ুয়া সহ একতলা পাকা বাড়ীতে থাকতো।

তাদের সাথে সখি বড়ুয়ার বড় ছেলে রবিসন বড়ুয়ার ছেলে সনি বড়ুয়াও গত রাতে থাকতে এসেছিল বলে জানা গেছে। কি কারণে কারা এ মর্মান্তিক খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে তা সিআইডি,পিবিআই,ডিবি সহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে বলে উখিয়া থানার ওসি (তদন্ত)জানান।

রত্নাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খাইরুল আলম চৌধুরী বলেন, “এক তলা ওই বাড়ির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, তবে ভেতর থেকে ছাদে ওঠার একটি সিঁড়ি ছিল। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ছাদ হয়ে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।” স্হানীয় ইউপি সদস্য মোক্তার আহমদ বলেন সম্ভবত বাড়ীর ছাদের ছিলাকোটার সিঁড়ি দিয়ে দূর্বৃত্তরা প্রবেশ করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোকেনদের চার ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই রবিসন বড়ুয়ার ইঞ্জিন ওয়ার্কশপের দোকান আছে। মেজ ভাই দীপু বড়ুয়া এক সময় স্থানীয় কোটবাজারে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। তবে বছর দেড়েক ধরে তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন চট্টগ্রামে। সেজ ভাই শিপু বড়ুয়া কোটবাজারে একটি ফার্নিচারের দোকান চালান।

আর সবার ছোট রোকেন গত দশ/বার বছর ধরে কুয়েতে থাকেন। মাস ছয়েক আগে দেশে এসে বেশ কিছুদিন থেকে মাস তিনেক আগে আবার কুয়েতে ফিরে যান। পূর্ব রত্নাপালংয়ে তার বাড়ির পাশেই আলাদা দুটি বাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকেন তার দুই ভাই দীপু ও শিপু বড়ুয়া।

শিপু বড়ুয়ার স্ত্রী রিপু বড়ুয়া বলেন, তার মেয়ে সনি প্রায় সময় দাদীর সাথে রোকেনের বাড়িতে থাকত। বুধবার রাতেও সে ওই বাড়িতে ছিল।  “মিলা বুধবার সন্ধ্যার দিকে কোটবাজার গিয়েছিল ঘরের বাজার করতে। সাড়ে ৭টার দিকে ও বাসায় চলে আসে। রাতে খেয়ে চারজন ঘুমিয়ে পড়েছিল বলেই আমরা জানি। আর কেউ ওই বাসায় থাকে না।” তার এক মাত্র মেয়ে সনি খুনে সে পাথরের মত হয়ে গেছে।

স্থানীয় প্রতিবেশি দিপালী বড়ুয়া জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মিলাদের ফ্রিজে রাখা মাছ আনতে গিয়ে কারো কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে নিহত সখি বড়ুয়া’র ছেলে শিপু বড়ুয়া’র স্ত্রীকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে রবিসন বড়ুয়াসহ কয়েকজন খোলা জানালা দিয়ে দেখি সখি বড়ুয়া’র নিথর রক্তাক্ত দেহ ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে।

পরে পাশ্ববর্তী লোকজন জড়ো হতে থাকে। থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে বাড়ির অন্য একটি দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।পুলিশ তিনটি ঘরে মেঝের ওপর চারজনের গলা কাটা রক্তাক্ত লাশ দেখতে পায় বলে উখিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল ইসলাম মজুমদার জানান।তিনি বলেন, “একটি ঘরে টিভি আর ফ্যান চালু অবস্থায় ছিল। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি দা পাওয়া গেছে ঘরের ভেতরে। হত্যাকারী সম্ভবত বাসার ভেতরেই ছিল। রাতে খুন করে ছাদ হয়ে বেরিয়ে গেছে।”

সকাল ৯ টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হত্যাকান্ডের বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন, পুলিশ সুপার এবি এম মাসুদ হোসেন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী,উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আদনান তাহিয়ান সহ কর্মকর্তা,জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে একজন এএসপির নেতৃত্বে চট্টগ্রাম থেকে সিআইডির একটি উচ্চ পর্যায়ের অ্যাভিডেন্স সংগ্রহ কারী টিম ঘটনাস্থলে আসেন। দীর্ঘ প্রায় তিন ঘন্টা ধরে হত্যাকান্ডের আলামত সংগ্রহ শেষে মৃতদেহ গুলো উদ্ধার করে সন্ধ্যা ৭ টার দিকে উখিয়া থানায় নিয়ে আসা হয়। লাশ গুলো যথাযথ ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে ময়না তদন্তের পর নিকট আত্মীয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে ওসি(তদন্ত) জানান।

পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেন বলেন, “এটি একটি পরিকল্পিত হতাকাণ্ড। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। কী কারণে কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা তদন্তের পরই নিশ্চিত করে বলা যাবে।”

জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন বলেন, “এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

উখিয়ার ইতিহাসে এধরণের মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের এ ঘটনা প্রথম। সারাদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষ ঘটনাস্হলে ছুটে আসে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ সহ সকলে এ ন্যাক্কার জনক ঘটনার নিন্দা প্রকাশ করেন। সকলের দাবী খুনী যে বা যারাই হোক দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দেয়া হউক।

ট্যাগ :