বাংলাদেশে অনেকের জন্য ঘরে থাকারও সুযোগ নেই

প্রকাশ: ২০২০-০৬-১০ ০৯:০১:৪২

ঢাকা, বাংলাদেশ – ঐশী জানে এই সময় উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো তার উচিত নয়। কোভিড-১৯ সম্পর্কে সে শুনেছে এবং জেনেছে যে, এই সময় ঘরে না থাকলে সে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু এই লকডাউনের মধ্যে দৈনন্দিনের খরচ চালাতে তার পরিবার অর্থ উপার্জনে সংগ্রাম করে চলেছে। ঐশী তাই ঘরের বাইরে, ঢাকা শহরে রাস্তায় ময়লা পরিষ্কারের সময় পাওয়া পরিত্যক্ত কিছু জিনিস বিক্রির চেষ্টা করছে সে।

১১ বছরের ঐশী বলে, ‘এগুলো বিক্রি করা ছাড়া বাবাকে সাহায্য করার আর কোন উপায় আমার নেই।’ ‘যখন বাবাকে সাহায্য করতে পরি না, তখন ছোট ভাইবোনদের দেখাশুনা ও গৃহস্থালীর কাজে মাকে সাহায্য করতে হয়’- বলে ঐশী।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ঐশীর জীবনের মতো গল্প অনেক শিশুর। এখানে অসহায় শিশুরা তাদের পরিবারকে একসঙ্গে জীবনযাপনে সহায়তা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে। ঐশীর পরিবার অনেক দরিদ্র হলেও সে জানে, দিনশেষে ফেরার জন্য তার একটি ঘর রয়েছে।

তবে বাংলাদেশে পথে পথে যেসব শিশু বসবাস করে তাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প সম্পূর্ণ আলাদা।

আঘাতের ওপর আঘাত

বাংলাদেশে রাস্তায় বসবাস করে হাজার হাজার শিশু এবং এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

কোভিড-১৯ মহামারি তাদের অনেকের জন্য বিরাট কষ্টের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। করোনাভাইরাস থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তাদের শুধু সাবান ও পরিষ্কার পানিরই অভাব নয়, বরং এই ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষায় ‘ঘরে থাকো’ বলে যে মৌলিক নির্দেশনা রয়েছে- সেটিরও তেমন কোন অর্থ নেই তাদের কাছে। কেননা, থাকার মতো ঘরই তো তাদের নেই!

রাস্তায় বসবাসকারী এসব শিশুকে মনোসামাজিক সহায়তা প্রদান ও অ-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দিতে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশের সমাজসেবা অধিদপ্তর যৌথভাবে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। এর চাইল্ড প্রোটেকশন সাপোর্ট সেন্টারস ওই শিশুদের মৌলিক সামাজিক সেবাসমূহ গ্রহণের সুযোগ করে দিচ্ছে, বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত থেকে রক্ষা করছে এবং সেবাগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে। এছাড়া ইউনিসেফ নিরাপদ আশ্রয়গুলোকে সহায়তা করছে, যারা ওই শিশুদের খাবার ও পানি প্রদান করছে, স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে এবং একটি নিরাপদ জায়গা দিচ্ছে, যেখানে শিশুরা রাস্তায় জীবন যাপনের চাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বস্তিতে খেলা করতে পারে।

“করোনা আমাদের এখানে আসতে পারবে না”

চৌদ্দ বছরের শাহিনা বলে, ‘বাইরের চেয়ে এখানে আমরা অনেক ভালো আছি। আমরা যদি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকি এবং শারীরিক দূরত্ব মেনে চলি, তবে করোনা এখানে আসতে পারবে না।’

ইউনিসেফের অংশীদার (পার্টনার) ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’ পরিচালিত একটি নিরাপদ আশ্রয়ে যে ২০ জন শিশু রয়েছে, শাহিনা তাদেরই একজন। আশ্রয় কেন্দ্রটিতে ইন্টারনেট নেই, কিন্তু শিশুরা টেলিভিশনে দেখানো ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে পারছে। তাছাড়া শিশুদের জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। নাম মনোয়ারা। কাছেই থাকেন এবং ফোন করলেই চলে আসেন।

শিক্ষক মনোয়ারা বলেন, ‘আমি তাদের প্রশ্নের উত্তর দেই। নোট লিখতে সহায়তা করি এবং প্রতিদিন বাড়ির কাজ (হোম ওয়ার্ক) দেই; যাতে স্কুল চালু হলে তারা অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে।’ ‘তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শারীরিকভাবে তাদের সুস্থ রাখা’- বলেন মনোয়ারা।

সুরক্ষা, ঘরে ও বাইরে

সমাজকর্মী শাহনাজ রহমান বলেন, এই আশ্রয় কেন্দ্রের শিশুরা তাদের প্রয়োজনীয় মনোসামাজিক সেবা পাচ্ছে- এটি অপরিহার্য। এমনকি এই লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যে যখন আশ্রয় কেন্দ্রের অনেক কর্মীই সেখানে আসতে পারছেন না, তখনও তারা সেবাটি পাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘শিশুরা কি করছে সেটা জানার জন্য আমি দিনে অন্তত চারবার ফোন করি। আমি তাদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা করি এবং কোভিড-১৯ মহামারি সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করি, যাতে তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি না হয়।’ পাশাপাশিইউনিসেফ লিফলেট দিয়েছে, যেখানে এই ভাইরাস  সংক্রমণ রোধের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে।এছাড়াও ইউনিসেফ থেকে বাড়তি সাবান ও জীবাণুমুক্ত করার সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে

“আমরা একে অপরকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করি।”

শিশুদের সঙ্গে দেখা করতে না পারার জন্য শাহনাজ রহমানের খারাপ লাগে। তবে তিনি জানেন যে, দু’জন আবাসিক তত্বাবধায়ক, দু’জন রাধুনী ও একজন নারী নিরাপত্তা কর্মীর কাছ থেকে শিশুরা তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছে। আর আশ্রয় কেন্দ্রের এই কর্মীরা (স্টাফ) সমাজকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যেই রয়েছেন এবং সার্বক্ষণিক শিশুদের ওপর নজর রাখছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘শিশুরা ঘরের মধ্যে দলবদ্ধ হয়ে খেলাধুলা ও লেখাপড়ায় নিজেদের ব্যস্ত রাখছে। এভাবে তারা একে অপরকে সহায়তা করছে।‘

১৬ বছরের হাসান বলেন, ‘আশ্রয় কেন্দ্রের শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না, বন্ধুদের সঙ্গে দেখাও হচ্ছে না। কিন্তু এখানে আমরা নিরাপদ বোধ করছি। আমরা সাবধানে রয়েছি এবং একে অপরকে সহায্য করার চেষ্টা করছি।’ ‘এখানে বড়রা ছোটদের উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে এবং আমরা একে অপরকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করি’- বলেন হাসান।

ট্যাগ :