বিদেশ ফেরত বাংলাদেশী রোহিঙ্গাদের নিয়ে যত আতংক, ক্যাম্প লক ডাউনের সিদ্ধান্ত হয়নি

প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৪ ০৭:৩৭:৩০

রফিকুল ইসলাম, উখিয়া,

সম্প্রতি বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে ফেরত আসা প্রবাসীদের অনেকের পরিচয় সুনিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাদের পরিচয় সনাক্তকরণ খুবই জটিল হয়ে উঠেছে। এসব কথিত বাংলাদেশী রোহিঙ্গারা বিশ্বব্যাপী চলমান সংক্রমণ করোনা ভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম বাহক বলে ধারণা স্হানীয় নাগরিক ও আশ্রিত রোহিঙ্গাদের।

উখিয়ার কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প ব্যবস্হাপনা কমিটির চেয়ারম্যান হাফেজ জালাল আহাম্মদ বলেন, অনেক রোহিঙ্গা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। তাদের অধিকাংশ বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সহ প্রচুর রোহিঙ্গা রয়েছে মালয়েশিয়ায়। কিছু রোহিঙ্গা রয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সহ নানা দেশে।

তিনি বলেন,এসব প্রবাসী রোহিঙ্গাদের প্রায় বাংলাদেশের কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান সহ বিভিন্ন জেলার ভুঁয়া ঠিকানায় দিয়ে পাসপোর্ট করে এসব দেশে পাড়ি দিয়েছিল। আনরেজিস্ট্রার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্প কমিটির সেক্রেটারি মোঃ নুর বলেন, বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাদের অনেকে বিভিন্ন দেশ থেকে ক্যাম্পগুলোতে তাদের নিকটজন, আত্মীয় স্বজনদের কাছে নিয়মিত আসা যাওয়া করে থাকে। এসব বিদেশ ফেরত রোহিঙ্গাদের নিয়ে ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা আতংকে রয়েছে।

উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় ১২ লক্ষ রোহিঙ্গার বসবাস। সরকার ১৭ মার্চ থেকে দেশব্যাপী করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত সতর্কতা জারি করলেও এর আগে থেকে বিদেশ ফেরত যেসব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত স্বজনদের কাছে আশ্রয় নিয়েছে তাদের খোঁজ খবর নিচ্ছে ক্যাম্প প্রশাসন।ক্যাম্পে আত্মগোপনে থাকা প্রবাসী রোহিঙ্গাদের তথ্য উপাত্ত সরবরাহ করার জন্য ব্লক ভিত্তিক রোহিঙ্গা মাঝিদের নির্দেশ দিয়ে ক্যাম্পে জারি করা হয়েছে সর্তক অবস্থা।

রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পের চেয়ারম্যান জানান, ১৫ দিনে আগে সৌদি আরব থেকে এফ ব্লকের নুরুল ইসলামের ছেলে এবাদুল্লাহ নামের এক যুবক ক্যাম্পে  স্বজনদের কাছে উঠে। বর্তমানে সে ক্যাম্প প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া ফেরত অপর রোহিঙ্গাকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রাখা হয়েছে বলে উখিয়া ইউএনও মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান।

গতকাল সোমবার (২৩ মার্চ) ভারতের হায়দ্রাবাদ থেকে ৪ সদস্যের একটি রোহিঙ্গা পরিবার অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে টেকনাফের -২৪ নং ক্যাম্পে স্বজনদের কাছে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গা নেতারা জানান, সোমবার ভোর ৫টার দিকে খুলনা হয়ে সড়ক পথে গাড়িযোগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে (২৪ লেদা ই ব্লকে) মোস্তাক আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তির বাসায় আসে পরিবারটি।

দুপুর ১২টার দিকে বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় একজন চার সদস্যের (মো. ছাদেক (২৫), তার স্ত্রী হোসনেআরা (২৩), শিশুসন্তান পারভেজ ( ৩) ও সাজেদা (১০ মাস) কে ক্যাম্প ইনচার্জের (সিআইসি) অফিসে নিয়ে যান।টেকনাফের নয়াপাড়া ও লেদা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) আব্দুল হান্নান বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায় যে, রোববার রাতে ভারতের হায়দারাবাদ থেকে বাংলাদেশে আসেন। তাদের ইউএনএইচসিআর ও আইওএম’র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পের ইনচার্জ মোঃ খলিলুর রহমানের বলেন, করোনা ভাইরাস থেকে  নিরাপদ থাকতে ক্যাম্পে সর্তক অবস্থা জারি করে অপ্রয়োজনে রোহিঙ্গাদের ঘর থেকে বের না হতে নিদের্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সাবান ও পানি সরবরাহ সহ  করোনা সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের সচেতনতা মূলক দিক নির্দেশনা দিচ্ছে এনজিওগুলো।

অত্যধিক রোহিঙ্গার উখিয়ার পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সত্যিই আমরা স্হানীয়রা রোহিঙ্গাদের কারণে চরম বেকায়দায় রয়েছি। হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ভুঁয়া ঠিকানায় পাসপোর্ট নিয়ে অনেক দেশে অবস্থান করছে। তারা নিয়মিত বাংলাদেশে আসা যাওয়া করে। এসব রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে ক্যাম্পে তাদের স্বজনদের নিকট অবস্থান করলেও তাদের খোঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাদের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর আশংকা রয়েছে বলে তিনি জানান।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, গত ১৯ মার্চ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী উখিয়ার বিভিন্ন ঠিকানায় ১০২ জন একাধিক দেশ থেকে দেশে এসেছেন। তন্মধ্যে ৫১ জন প্রবাসীকে কোয়ারান্টাইনের আওতায় আনা হয়েছে। বেশ কয়েকজনকে স্ব স্ব ঠিকানা অনুযায়ী খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নজনের দাবীর বরাত দিয়ে ইউএনও বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রােহিঙ্গা ক্যাম্প লক ডাউন করার আপাতত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি  । করােনা ভাইরাস প্রতিরােধে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও চলমান কার্যক্রম আরাে জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে । রােহিঙ্গা বিষয়ক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারনী কমিটির ২২ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে ঐ সভায় অংশ  নেয়া উখিয়ার ইউএনও মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান।

ট্যাগ :